বাংলা শিশু সাহিত্যের বিস্তৃত আকাশে যে কজন সাহিত্যিক সৃজনশীলতা, দেশাত্মবোধ এবং মানবিক মূল্যবোধের দীপ্ত আলো ছড়িয়ে চলেছেন, তাঁদের অগ্রগণ্যদের একজন বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক রফিকুর রশীদ। গল্প, কবিতা, ছড়া, গান ও উপন্যাস-সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ। শিশুমনের কল্পনা, প্রকৃতির সৌন্দর্য, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁর লেখনীকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মর্যাদা। তাঁর সাহিত্য যেন আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা, যেখানে জ্ঞান, সৌন্দর্য ও মানবিকতার সুষম সমন্বয় ঘটেছে। ১৯৫৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলায় তাঁর জন্ম। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই সাহিত্যচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে স্বাধীনতার চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব, দেশপ্রেম এবং মানবিক মূল্যবোধকে তিনি তাঁর সৃষ্টির প্রধান উপজীব্য করেছেন। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা তাঁর রচনাগুলো ইতিহাস চেতনা, নৈতিক শিক্ষা ও সৃজনশীল কল্পনার অপূর্ব সংমিশ্রণ। শিশু সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ২০২১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংক–শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, দ্রোহী কথাসাহিত্যিক আব্দুর রউফ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের নানা সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এসব স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘদিনের নিরলস সাহিত্য সাধনার উজ্জ্বল স্বাক্ষর। ইতোমধ্যে তাঁর প্রায় শতাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি গ্রন্থে শিশু-কিশোরদের জন্য রয়েছে জ্ঞান, আনন্দ, দেশপ্রেম এবং মানবিকতার অনন্য বার্তা। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে মেহেরপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ কিশোর গল্প, মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প, মুক্তিযুদ্ধের কিশোর উপন্যাস, সেরা কিশোর গল্প, বারো রাজ্যের রূপকথা, স্বপ্নে ভরা কিশোর বেলা, রবীন্দ্র জীবনের কিশোর গল্প, নির্বাচিত মুক্তিযুদ্ধের গল্প, জোড়া ভূতের কিশোর উপন্যাস, ছায়ার পুতুল, ওরা সবাই যুদ্ধে গেল, ভূতের বাড়ি, সেই এক ভুতুড়ে ক্লাব, নাম তার মেঘ নীল এবং ওরা সবাই গুড বয়। তাঁর প্রতিটি রচনাই শিশু-কিশোরদের কল্পনাশক্তি বিকাশ, ইতিহাসচেতনা ও নৈতিক বোধ জাগ্রত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি শিক্ষা ক্ষেত্রেও তিনি রেখেছেন অনন্য অবদান। দীর্ঘদিন গাংনী কলেজে সুনাম ও নিষ্ঠার সঙ্গে অধ্যাপনা করেছেন। একজন শিক্ষক হিসেবে যেমন তিনি শিক্ষার্থীদের আলোকিত করেছেন, তেমনি একজন সাহিত্যিক হিসেবে আলোকিত করেছেন অসংখ্য পাঠকের মনন।
বাংলাদেশ বেতার, রাজশাহীর গীতিকার হিসেবেও তিনি পরিচিত। তাঁর রচিত দেশাত্মবোধক ও আধুনিক গান মানুষের হৃদয়ে দেশপ্রেম, মানবতা ও সৌন্দর্যবোধের সুর জাগিয়ে তোলে। শব্দের মাধুর্য আর ছন্দের শৈল্পিক ব্যবহারে তিনি সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। রফিকুর রশীদের সাহিত্যকর্ম কেবল বিনোদনের জন্য নয়,তা নতুন প্রজন্মকে সুশিক্ষা, দেশপ্রেম, ইতিহাসচেতনা এবং নৈতিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করার এক শক্তিশালী মাধ্যম। তাঁর লেখনীতে শিশুরা যেমন খুঁজে পায় স্বপ্নের রঙ, তেমনি বড়রাও আবিষ্কার করেন জীবন ও সমাজকে নতুন করে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলা শিশু সাহিত্যের ইতিহাসে রফিকুর রশীদ একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর সৃষ্টির আদিত্য আলো আগামী দিনেও নতুন প্রজন্মের পথচলায় প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। সাহিত্যসাধনার এই দীপ্ত অভিযাত্রা তাঁকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একজন স্মরণীয় এবং শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দীর্ঘকাল বাঁচিয়ে রাখবে।