জীবনী
উপমহাদেশের প্রখ্যাত বাঙালি ইসলাম প্রচারক, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক, বহুভাষাবিদ এবং একাধিক গ্রন্থের প্রণেতা আলোকবর্তিকা মুন্সী শেখ জমিরুউদ্দিন। মুন্সী শেখ জমিরুউদ্দিন ১৮৭০ সালের ২৯ জানুয়ারি মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার গাড়াডোব গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জ্ঞান, সাধনা ও সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে তিনি সমকালীন মুসলিম সমাজে সভ্য ও সুন্দরের বার্তাবাহক হয়ে ওঠেন। শিক্ষাজীবনে নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তিনি ভারতের এলাহাবাদে অবস্থিত সেন্ট পলস ডিভিনিটি কলেজ থেকে ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এ পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে ‘উচ্চমানের পাঠক’ বা ‘পাঠক রত্ন’ উপাধিতে ভূষিত হন। বিদ্যাবিনোদ মুন্সী শেখ জমিরুউদ্দিন বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি, সংস্কৃতসহ ল্যাটিন, গ্রিক, হিব্রু ও ইরানি ভাষা মিলিয়ে মোট চৌদ্দটি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায় তাঁর গভীর জ্ঞান ও দখল সমকালীন সময়ে এপার বাংলা ও ওপার বাংলায় বিশেষভাবে প্রশংসিত ছিল। তাঁর বহুভাষিক দক্ষতা ও যুক্তিনিষ্ঠ ইসলামি ব্যাখ্যা তৎকালীন খ্রিস্টান মিশনারি তৎপরতার মুখে মুসলমান সমাজকে আত্মপরিচয়ে দৃঢ় হতে প্রেরণা জুগিয়েছিল। তিনি ‘ইসলামের গৌরব’-সহ বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর গবেষণা ধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশিত হতো এশিয়াটিক ত্রৈমাসিক সাময়িকী, আফ্রিকায় ইসলাম এবং লন্ডনের সেন্ট জেমস গেজেট পত্রিকায়। নিজের লেখা ও বিভিন্ন ভাষায় রচিত গ্রন্থে সমৃদ্ধ তাঁর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ছিল তৎকালীন জ্ঞানচর্চার এক অনন্য নিদর্শন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি লেখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া বাঙালি মুসলমান সমাজকে জাগ্রত ও সচেতন করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করে গেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য— বিধবার দুঃখ, খ্রিস্টীয় ধোঁকা, সত্যলোক, হযরত ঈসা (আ.) কে এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)। অন্যদিকে মেহেরপুরের কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও গবেষক মুহাম্মদ রবিউল আলম ১৯৯৪ সালে মুন্সী শেখ জমিরুউদ্দিনের জীবন ও কর্ম নিয়ে রচনা করেন মুন্সী শেখ জমিরুউদ্দিন : জীবন ও সাহিত্য গ্রন্থটি, যা ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত হয়।
১৯৩৭ সালের ২ জুন নিজ জন্মগ্রাম গাড়াডোব গ্রামে নিজ বাসভবনে তিনি ইন্তেকাল করেন। যে সামাজিক বাস্তবতায় তিনি সংগ্রাম চালিয়েছিলেন, তা আজ অনেকাংশে পরিবর্তিত হলেও ইসলাম প্রচার ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে তাঁর অবদান আজও গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণীয়। বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য যে, নব্বইয়ের দশক থেকে গাড়াডোব গ্রামের সিনিয়র সাংবাদিক আইনুল হক মুন্সী শেখ জমিরুউদ্দিনের স্মৃতি সংরক্ষণে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক সহ বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করে জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ম্যাগাজিন প্রকাশ এবং আলোচনা সভার আয়োজন স্থানীয়ভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। তবে তিনি দীর্ঘদিন সুইডেন প্রবাসে থাকায় সাম্প্রতিক সময়ে এসব আয়োজন আগের মতো ধারাবাহিক ভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে না—যা নিঃসন্দেহে আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্বের এক অপূর্ণতাকেই নির্দেশ করে।